May a good source be with you.

সমালোচনাহীন শ্রদ্ধাঞ্জলি: সৌজন্য না ভক্তির প্রকাশ?

বাজপেয়ী ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইকন একথা নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বলা যায় ।

১৯৮০র দশকে আমাদের বেড়ে ওঠা। পশ্চিমবঙ্গে তখন বামফ্রন্টের শাসন। সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা হাতে গোনা। তারা কেউই সরকারের প্রতি তেমন বন্ধুভাবাপন্ন নয়। বিশেষত সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকটি ঘোষিত পুঁজিবাদী, ফলত ঘোর বামবিরোধী। কিন্তু একের পর এক নির্বাচনে জয়লাভ করা ক্ষমতাসীন জোটকে তো ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, শুধুই খারাপ কাজ করছে এমনটাও বলা চলে না। সেই কারণে প্রায়শই যা ঠারেঠোরে অথবা স্পষ্টাস্পষ্টি লেখা হত তা এই যে বড় শরিক সিপিএম দলটা তত খারাপ নয়, কর্মীরা অনেকেই বেশ সৎ, পরিশ্রমী। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী লোকটি, অর্থাৎ জ্যোতি বসু, সুবিধের নন।

বাংলা, ইংরিজি দুটো ভাষার কাগজগুলোতেই এটা তখন বেশ চালু তত্ত্ব। প্রমাণ হিসাবে জ্যোতিবাবু রাশভারী, মানুষের সাথে মেশেন না, সূর্যাস্তের পর অভিজাত ক্লাবে সময় কাটান, ইন্দিরা ভবন একটি প্রাসাদোপম আবাস — এইসব লেখা হত। ভোজবাজির মত সব পালটে গেল এই সহস্রাব্দের গোড়ায়। জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন, নতুন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তারপর থেকে প্রচারটা দাঁড়াল এরকম যে বুদ্ধবাবু মানুষটা ভাল কিন্তু তাঁর পার্টিটা ভাল নয়। তিনি যে ভাল কাজটাই করতে যান, তাঁর পার্টি বাগড়া দেয়। মানে জ্যোতি বসু ছিলেন ঠিক পার্টির মাথায় ভুল লোক, আর বুদ্ধদেববাবু ভুল পার্টির মাথায় ঠিক লোক। দুজনেই যে একই পার্টির নেতা সেটা কোন আলোচ্য বিষয় নয়।

নেতাকে তাঁর পার্টির মতাদর্শ, কর্মসূচী থেকে আলাদা করে নিয়ে দেখার সেই ধারা অটলবিহারী বাজপেয়ীর ক্ষেত্রে হাস্যকর স্তরে পৌঁছে গেছে। তবু যে অবাক হচ্ছি না তার কারণ এতদ্বারা ব্যাখ্যা করা গেল।

আন্দাজ করা যায় দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ পর্যন্ত পড়েই উদারপন্থী যে কোন পাঠক রে রে করে উঠবেন। “সদ্যপ্রয়াত মানুষের নিন্দা কেবলমাত্র আমাদের সংস্কৃতিবিরোধী তাহা নহে, ইহা সাক্ষাৎ অসভ্যতা” ইত্যাদি। তর্কের খাতিরে যুক্তিটা মেনে নেওয়া গেল। সত্যিই তো। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মত নেতা, যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা, মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করার অজস্র অভিযোগে অভিযুক্ত, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের কালো অধ্যায় জরুরী অবস্থা জারীর মন্ত্রণা দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে, তিনি মারা যাওয়ার পরে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম যেরকম সংযমী প্রশংসা করেছিল তাতে অন্যরকম ভাবার কোন অবকাশ থাকে না। রুনু গুহ নিয়োগীর মত কুখ্যাত এবং আদালতের রায়ে নিরপরাধ মানুষের উপরে পুলিশি হেফাজতে অত্যাচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত পুলিশকর্মী যে সদ্যপ্রয়াত লোকটিরই আশীর্বাদপুষ্ট সেকথা লেখা কি আর শোভন? না। অতএব কী লেখা হল?

‘হিন্দুস্তান টাইমস’ লিখল:

“With Siddhartha Shankar Ray’s death at 90 on Saturday [৬ই নভেম্বর ২০১০], curtains were drawn on the most interesting, flamboyant and colourful chapter in post-Independence West Bengal.”

অর্থাৎ সরকারী সম্মতিতে শত শত নকশাল যুবকের হত্যা, তাদের পরিবারের উপর পুলিশি নিপীড়ন, অন্যান্য বিরোধীদের উপর হওয়া অত্যাচার — সবই স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবাংলার সবচেয়ে রঙীন অধ্যায়ের অন্তর্গত।

‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ দুঃখের সঙ্গে জানাল “Ray, Bengal’s last aristocrat politician, departs.” প্রতিবেদনটি এও জানাতে ভোলেনি যে সিদ্ধার্থশঙ্কর বলতেন লোকে তাঁকে যতটা খারাপ ভাবে তিনি আসলে তত খারাপ নন। তিনি তো সিপিএম সাংসদ জ্যোতির্ময় বসুকে মুক্তি দিয়েছিলেন, কিছু নকশাল ছেলের বাবা-মা তাঁকে একান্তে অনুরোধ করায় তিনি তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।

‘দ্য টেলিগ্রাফ’ কাগজে সত্তরের দশকে সিদ্ধার্থশঙ্করের বিশ্বস্ত সহচর সুব্রত মুখার্জি এক মন ছুঁয়ে যাওয়া রচনায় লিখলেন তাঁর মানুদা কত সৎ ছিলেন, কখনো চেকে ছাড়া পারিশ্রমিক নিতেন না ওকালতি করার সময়ে। আরো লিখলেন:

“The Naxalites had held the entire state and its peace-loving people to ransom. The government had to issue a slogan like “Live and let live” (banchoon ebang banchte din) in Bengali. Trams would carry these words on them. Since people were scared to go out after sundown, night shows were discontinued and noon shows were introduced instead… Siddhartha Shankar Ray was committed to bringing back the rule of law by crushing the Naxalite movement.“

‘আউটলুক’ পত্রিকার প্রতিবেদনে তো সিদ্ধার্থশঙ্কর পেলেন নায়কের মর্যাদা:

“Supported by a public rejection of [Charu] Majumder’s ‘annihilation line,’ the West Bengal police under Ray could effectively intervene in countering the Naxalites and bring an end to the movement. Frustrated, the Naxalites accused Ray of violating their human rights. The CPI(M) also accused him of being partisan when their activists and sympathisers were killed by Congress henchmen between 1972-77. He was to later reminisce in an interview to Outlook that after the Bangladesh War Indira Gandhi had told him that ‘lawlessness had to be stamped out of Bengal.’

In a letter written to Gandhi on August 30, 1974, Ray informed her that he was taking a firm line against anti-socials or those connected with them.

“I know that this may create difficulties, but I have reached the limit of my patience. I have really nothing to lose in taking this line. Bengal has no future whatsoever unless all this is stopped. If the party goes against me for taking this attitude I am quite willing to step down,” the letter said.”

যা-ই হোক, এসবে আপত্তির কিছু নেই। কারণ এ হল সদ্যপ্রয়াতের নিন্দা না করার রুচিশীলতারই বহিঃপ্রকাশ। এরই দৃষ্টান্ত আমরা বাজপেয়ীর মৃত্যুর পর দেখছি। কিন্তু ব্যাপারটা যদি ধারাবাহিক হত তাহলে যুক্তিটা মেনে নিতে অসুবিধা হত না।

যে বছর সিদ্ধার্থশঙ্কর মারা যান, সেবছরেরই গোড়ার দিকে, অর্থাৎ ১৭ই জানুয়ারী, মৃত্যু হয় কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসুর, যিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সিদ্ধার্থশঙ্করের চেয়ে সফল এবং সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাবের দিক থেকে তাঁর সমকক্ষ বা হয়ত তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন। আর যা-ই হোক, সিদ্ধার্থশঙ্কর প্রধানমন্ত্রী হোন এমনটা তো কংগ্রেস ছাড়া অন্য দলের লোকেরা দুঃস্বপ্নেও কখনো চাননি। বাজপেয়ীর সঙ্গেও জ্যোতি বসু তুলনীয় নানা কারণে।

প্রথমত, বাজপেয়ী ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইকন একথা নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বলা যায় কারণ মোদী প্রায় জিতে যাওয়া দলের ক্যাপ্টেন, দল তৈরি করেননি। জ্যোতিবাবু এদেশের বামপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে বড় আইকন। ১৯৬৪ সালে সিপিআই দু টুকরো হয়ে যাওয়ার পর জন্ম নেওয়া একটা দল যে অব্যবহিত পরেই নকশাল আন্দোলনের অভিঘাত সামলেও ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী বাম দল হয়ে উঠতে পেরেছিল তার জন্যে যে লোকদুটির বিরাট কৃতিত্ব তাঁদের একজন জ্যোতি বসু, অন্যজন হরকিষেণ সিং সুরজিৎ।

দ্বিতীয়ত, জ্যোতি বসু এবং বাজপেয়ী, দুজনেই দক্ষতার সঙ্গে জোট সরকার চালিয়েছেন। জ্যোতিবাবু স্থিতিশীল জোট সরকার চালানোর ক্ষেত্রে নজির সৃষ্টি করেছেন একটানা ২৩ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বে। আজ অটলবিহারীর যে দলমতনির্বিশেষে গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হচ্ছে বারবার, সেটাও ভারতীয় রাজনীতিতে জ্যোতি বসু ছাড়া অন্য কারো ছিল কিনা সন্দেহ।

কিন্তু মজার কথা, এইসব অথবা প্রশাসক হিসাবে তাঁর সাফল্যগুলো, যেমন পশ্চিমবঙ্গকে ১৯৮৪র শিখবিরোধী দাঙ্গা, ১৯৯২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মত জাতীয় বিপর্যয়ের সময়ে শান্ত রাখা, ভূমি সংস্কার, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের গরীব মানুষের হাতে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মত সাফল্য নিয়ে জ্যোতিবাবুর মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যম খুব বেশি আলোচনা করেনি। ক্ষমতায় আসার আগে স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং বিরোধী নেতা হিসাবে তাঁর কার্যকলাপও বামমনস্ক বলে পরিচিত ‘দ্য হিন্দু’ ছাড়া অন্য সংবাদমাধ্যমে তেমনভাবে উল্লিখিত হয়নি।

‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ ১৯৯৬ এ তাঁর প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার বিষয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে পার্টিতে তাঁর একা হয়ে যাওয়াকেই ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় বলে গণ্য করেছিল।

‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ জ্যোতিবাবুর প্রশংসা করেও বলতে ছাড়েনি যে তাঁর আমলে বাংলা শিল্পে পিছিয়ে পড়েছে। এমনকি, সেই সিদ্ধার্থশঙ্কর, যিনি জ্যোতিবাবুর বাল্যবন্ধুও বটে, লাইভ মিন্ট এ লেখেন:

“The flight of industries from the state started in the early 1960s, when Jyoti, despite his control over the party — the undivided Communist Party of India and later the CPM — chose not to oppose militancy by trade unions.

In those days, all foreign airlines had offices in Kolkata — they had thought the city was to become the main hub in South Asia. But it didn’t. People started moving manufacturing units from Kolkata because the Centre of Indian Trade Unions (Citu) made life miserable for businessmen.

The CPM forgot that industry was just as important as agriculture.”

১৯৬০ এ যা ঘটেছে কংগ্রেস আমলে, তার দায়ও জ্যোতিবাবুকে নিতে হল। অর্থাৎ রাজনীতিবিদ জ্যোতি বসুর মূল্যায়নে কেউ সদ্যমৃত বলে এক ইঞ্চি জমি ছাড়েননি।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল অবশ্য ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এবং ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’। দুটো কাগজই গোটা পাঁচ ছয়েক পাতা ধরে জ্যোতিবাবুর আমলে পশ্চিমবঙ্গের কী কী ক্ষতি হয়েছে পাঠকদের তা জানিয়েছিল। টেলিগ্রাফের মূল প্রতিবেদনের কয়েকটা লাইন পড়লে এ লেখার গোড়াতেই যে অদ্ভুতুড়ে তত্ত্বের উল্লেখ করেছি তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

“Once he felt safe about staying on in power, however, Basu left it to his party to change Bengal in accordance with its script. If land reforms became the landmark policy initiative in the early years — beyond that point the CPM seemed to have lost the plot — Basu became the face of a party that had perfected the art of winning elections.

By the time [Buddhadeb] Bhattacharjee and the CPM came to realise it was time to bring the new economy to Bengal, the long party rule Basu had done little to change made a real breakthrough almost impossible to achieve. With the failures of Basu’s long reign, Bhattacharjee had little chance of success in his late attempts at recovering lost ground for Bengal.”

আরো নানা লেখার সঙ্গে একটি লেখা ছিল যার শিরোনাম “Controversies that dogged the pragmatic chief minister”। সেখানে জ্যোতি বসুর শাসনকালে রাজ্যে ঘটা এমন কোন খারাপ ঘটনা নেই যার জন্যে তাঁকে দায়ী করা হয়নি। অথচ আজ বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্যে বাজপেয়ীকে দায়ী করলে সৌজন্য, সংসদীয় রাজনীতির শিষ্টাচারের প্রশ্ন উঠে আসছে।

বামপন্থীরা কতটা অসভ্য, সংস্কৃতিহীন সেসব নিয়ে সোশাল মিডিয়া মুখরিত এখন, যদিও বামপন্থী নেতারা কেউই বাজপেয়ী সম্পর্কে একটিও খারাপ শব্দ উচ্চারণ করেননি। বরং সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি নিজে গিয়ে মরদেহে মাল্যদান করে এসেছেন। শুধু বামপন্থী দলগুলোর সমর্থকরা (অনেকে আবার আদৌ বামপন্থী নন, শুধু বাজপেয়ীর সমালোচনা করার অপরাধেই তাঁদের বামপন্থী বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে) কে কী বললেন তাতেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আজকের দক্ষিণপন্থীদের অতিপ্রিয় বাঙালি সাংবাদিক কাঞ্চন গুপ্ত কী লিখেছিলেন ‘দ্য পাইওনিয়ার’ কাগজে তাঁর রাবিবারিক কলামে:

“Uncharitable as it may sound, but there really is no reason to nurse fond memories of Jyoti Basu. In fact, there are no fond memories to recall of those days when hopelessness permeated the present and the future appeared bleak. Entire generations of educated middle-class Bengalis were forced to seek refuge in other states or migrate to America as Jyoti Basu worked overtime to first destroy West Bengal’s economy, chase out Bengali talent and then hand over a disinherited State to Burrabazar traders and wholesale merchants who overnight became ‘industrialists’ with a passion for asset-stripping and investing their ‘profits’ elsewhere.

As a Bengali, I grieve for the wasted decades but for which West Bengal, with its huge pool of talent, could have led India from the front. I feel nothing for Jyoti Basu.”

সদ্যমৃতের সৌজন্য, স্পষ্টতই, বামপন্থীদের প্রাপ্য নয়। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পরে কোন সাংবাদিক লেখেননি তিনি বিদেশ সফরে গিয়ে কোথায় ভাল বিফ স্টেক পাওয়া যায় তার খোঁজ দিয়েছিলেন কিনা। কেউ লেখেননি ইউরোপে গিয়ে কোন সকালে জ্যোতিবাবু রোদচশমা আর টি শার্ট পরে সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলেন কিনা। সাধারণ শ্রোতাকে বহু দশক মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা বক্তা জ্যোতি বসুকে নিয়েও কেউ কলমের কালি খরচ করেননি, কারণ তিনি তো আর বক্তৃতার মাঝে স্বরচিত কবিতা বলতে পারতেন না। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তাঁর লেখা একটি দুটি বইয়ের জন্যে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে স্থান দিতে কেউ উঠেপড়ে লাগেনি সেইসময়। আসলে সংবাদমাধ্যমের চোখে বাজপেয়ী যেমন ভুল পার্টির ঠিক লোক রয়ে গেলেন, তেমনি জ্যোতিবাবু ঠিক পার্টির ভুল লোক।

আমাদের দেশের মানুষের মনে, এবং সেইজন্যেই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, ব্যক্তিসর্বস্বতার ব্যাধি বড় প্রবল। আমরা ভাল সরকার চাই না, নায়ক চাই। সরকার ব্যর্থ হলেও তেমনি খলনায়ক খুঁজি, সরকারী দলের মতাদর্শ বা কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ভুলে যাই। বুঝতে অসুবিধা হয় না কী কারণে প্রবল দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও জয়ললিতা মারা গেছেন এই সংবাদে সমর্থকরা আত্মহননের পথে যায়, মোদী বা মমতার মত আত্মম্ভরী একনায়ক কেন জনপ্রিয় হয়।

১৯৮০র দশকের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ফিরে যাই। সেইসময়ে প্রতি রবিবার সকালে চোপড়া ভাইদের মহাভারত শুরু হত, আর পাড়ায় পাড়ায় টিভি থেকে ভেসে আসত মন্ত্রোচ্চারণ:

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতিভারত

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানম সৃজাম্যহম।।

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায়চ দুষ্কৃতাং

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।“

“হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয়, অধর্মের উত্থান হয় তখনই আমি অবতীর্ণ হই। সাধুদের উদ্ধার করে, অসাধুদের বিনাশ করে ধর্ম স্থাপনের জন্যে যুগে যুগে আমি অবতীর্ণ হই।“

এই অবতারবাদ আমাদের মননে গেঁথে আছে। আমরা আসলে নেতা খুঁজি না, অবতার খুঁজি। সেই ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘মনু মহম্মদ হিটলার’ গ্রন্থে আজিজুল হক ভূয়োদর্শী ঋষির মত লিখেছিলেন:

“ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদ আসবে ধর্মের হাত ধরে। কারণ এখানে প্রচলিত সামাজিক দর্শন বহু যুগ ধরে একজন সর্বাধিনায়কের অভিভাবকত্বের পটভূমি তৈরি করে রেখেছে। আর্থসামাজিক কারণেই সাম্প্রদায়িকতার আবহাওয়া বিদ্যমান। একদিকে হিন্দু ধর্মের ‘রহস্যবাদ’ বা মিস্টিসিজম-এর প্রতি তরুণদের এবং ‘বিচ্ছিন্ন আউটসাইডারের’ আকর্ষণ বাড়ছে। অন্যদিকে মুসলমানরাও ইসলাম ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসকে সযত্নে অনড় অটল বলে রক্ষা করে চলেছে। অর্থাৎ ভারতবর্ষে আর্থ-রাজনৈতিক ভিত্তি এবং সামাজিক মনস্তত্ত্ব এমন একটা জায়গায় এসেছে, যখন মানুষ একটা ডুসে বা ফুয়েরারের জন্য প্রতীক্ষা করছে যিনি ধর্মের হাত ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভেলকি দেখাতে পারেন।“

বাজপেয়ী সেই ফুয়েরারের পূর্বসুরী। কোন কোন সংবাদমাধ্যম তো তাঁকে ভীষ্ম পিতামহ বলে উল্লেখও করেছে। পিতামহের সমালোচনা কে-ই বা সহ্য করবে?

अब आप न्यूज़ सेंट्रल 24x7 को हिंदी में पढ़ सकते हैं।यहाँ क्लिक करें
+