May a good source be with you.

Religious Polarization In Bengal: Where The Ruling TMC & Opposition BJP Come Together

বাঙালি সমাজে এতদিন প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকা ঘৃণার তীব্রতা এমনই যে চিরকালীন আইকনরাও বাঁচতে পারছেন না।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়ে গেছে। বাঙালির মহাকবি বলে গেছেন “আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া / বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া”। এখন এক মাস বাঙালি আপন হতে বাহির হয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে। শহর, মফঃস্বল, গ্রাম — যেখানেই যান, যদি পাড়ায় একটাও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কি জার্মানির পতাকা না দেখা যায় তাহলে সে পাড়ায় কজন বাঙালি আছে খোঁজ নিয়ে দেখবেন। এই এক মাস মোদী, মমতা, বিমান, সূর্যকান্ত সকলেরই কম নিন্দে মন্দ হবে কারণ এই ভূখন্ডে একটাই আলোচ্য বিষয় এখন — বিশ্বকাপ। যদিও সেখানে ভারতের তথা বাংলার কোন উপস্থিতি নেই।

কি ভালই না হত যদি এই বিশ্বলোকটা ঠিক নিজের বাড়ির দরজার বাইরে থেকেই শুরু হত। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় এখন মোটেও তা হচ্ছে না। লায়োনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর জন্যে বাঙালি হিন্দুর বুকভরা ভালবাসা আছে, তারপরেও মোহামেদ সালাহর জন্যে একটু জায়গা ছাড়া আছে মনের কোণে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে বাঙালি মানতেই আপত্তি আছে অনেকের।

তাই পথে পথে নানা রঙের পতাকা দেখে যা-ই মনে হোক, আসলে আপন হতে বাহির হওয়ার বদলে আজকের বাঙালি যত দিন যাচ্ছে, গুটিসুটি হয়ে আরো বেশি নিজের কোটরে ঢুকে পড়ছে। সত্যজিতের আগন্তুক মনমোহন মিত্রের ভাষায় যাকে বলে “কূপমণ্ডূক।“ ধর্মান্ধতা, পরজাতিবিদ্বেষ ইত্যাদি যে দোষগুলো পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ছিল না বলে বরাবর মনে করা হত সেগুলো প্রকট হয়ে পড়ছে।

শাস্ত্রে বলেছে অপ্রিয় সত্য বলা উচিৎ নয়। এখন কথা হচ্ছে, বাড়ি দুলছে বুঝতে পেরে আপনি যদি “ভূমিকম্প” বলে চিৎকার না করে চুপটি করে বসে থাকেন তাহলে শুধু যে নিজের প্রাণ সংশয় হবে তা নয়, পরিবারের অন্য যারা গভীর ঘুমে তাদেরও মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। অতএব শাস্ত্রবাক্য অগ্রাহ্য করে তেতো কথাগুলো লিখতেই হল। কিন্তু লিখলেই তো হল না, প্রমাণ দিতে হবে। বাঙালি নিজের প্রগতিশীলতার নিন্দা সহজে হজম করার লোক নয়।

সোশাল মিডিয়ার যুগে প্রমাণ দেওয়া মোটেই কষ্টসাধ্য নয়। হোয়াটস্যাপে ঘুরে বেড়ানো মেসেজগুলো এবং ফেসবুকে বারবার শেয়ার হওয়া পোস্টগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয় যেসব দোষ আমরা চিরকাল “ওসব ইউ পি, বিহারে হয়” বলে উড়িয়ে দিয়ে এসেছি চিরকাল, সেগুলো আমাদের মধ্যে দিব্যি গেড়ে বসেছে।

যেমন একটি মেসেজ কিছুদিন ধরে হোয়াটস্যাপে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেখানে স্বাধীনতার আগে থেকে বাংলায় মুসলমানদের জনসংখ্যা লিখে ভবিষ্যদ্বাণী করা আছে ২০৪০ সাল নাগাদ এ রাজ্যে মুসলমানরা হবেন ৮৮%। একটির সঙ্গে একটি ফ্রি দেওয়ার মত আরো একটি ভবিষ্যদ্বাণী হল, ঐ সময় নাগাদ একজন মুসলমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। অতএব প্রলয়, ঝঞ্ঝা, প্লাবন। এই বেলা হিন্দু রুখে দাঁড়াও ইত্যাদি। আপনি বলতেই পারেন এসব একটা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলের কুকীর্তি। এ থেকে প্রমাণ হয় না বাঙালি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। আপনি ঠিক বলবেন এবং ভুলও করবেন। কারণ এই মেসেজগুলো ছড়াতে পারছে আমার, আপনার মত লেখাপড়া জানা লোকেরা বিস্ফারিত নেত্রে এগুলো গিলছে এবং ফরোয়ার্ড করছে বলে। লক্ষ্য করলে দেখবেন আপনি এগুলো পাচ্ছেন এমন লোকের থেকে যে আপনার নিকটাত্মীয় বা দীর্ঘদিনের পরিচিত, যার কোন রাজনৈতিক দলের আই টি সেলের সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বা শূন্য । আসলে মস্তিষ্কের গভীরে প্রচ্ছন্ন প্রতিহিংসা, ঘৃণা, ভয়ের কাছে এসব মেসেজ এমন উদ্দীপকের কাজ করে যে যুক্তির য না থাকলেও বাঙালিরা এসব বিশ্বাস করছে এবং পত্রপাঠ ফরোয়ার্ড করছে। যেমন পাটিগণিতের পিন্ডি চটকানো মুসলমান জনসংখ্যা নিয়ে ঐ মেসেজটা আমাকে পাঠিয়েছিলেন এক অঙ্কের মাস্টারমশাই। স্পষ্টতই তাঁর গণিতশিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যেতে এই মেসেজটির কোন অসুবিধাই হয়নি।

বাঙালি সমাজে এতদিন প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকা ঘৃণার তীব্রতা এমনই যে চিরকালীন আইকনরাও বাঁচতে পারছেন না। যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে একটি পোস্ট শেয়ার হচ্ছিল ফেসবুকে। সেখানে বলা হয়েছে তিনি বিধর্মী, হিন্দু ধর্মকে অপমান করেছেন মেঘনাদবধ কাব্য লিখে।  মানা যায় যে কোন রাজনৈতিক দলের আই টি সেল পোস্টটার নির্মাতা। কিন্তু সেই পোস্ট শেয়ার করছে শয়ে শয়ে লেখাপড়া জানা বাঙালি। সেটা তো আর ঘাড় ধরে করানো হচ্ছে না।

শ্রীচৈতন্য, সে যুগের প্রান্তিক বাঙালির মনের মানুষ শ্রীচৈতন্য, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে যাঁর শিষ্য হয়েছিল, সেই শ্রীচৈতন্যকে ইসলামের দালাল প্রমাণ করতে চেয়েও একটি হোয়াটস্যাপ পোস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছিল বছরখানেক আগে। এ ছাড়াও ছদ্ম খবরের (fake news) মাধ্যমে অশান্তি লাগানোর অক্লান্ত প্রচেষ্টা তো চলেছেই। বস্তুত গত কয়েক মাসে তো কলকাতা পুলিশের  অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের টুইটার হ্যান্ডেলে আর ফেসবুক পেজে জমা পড়া অসংখ্য সোশাল মিডিয়া পোস্টের সত্যাসত্য বিচার করা এবং মানুষকে সাবধান করা।

এসব কারা করছে তা নিয়ে খুব একটা সংশয়ের জায়গা নেই। কিন্তু এসব যারা গিলছে তারা যে সংখ্যায় বেড়েই চলেছে সেটাই বেশি বিপজ্জনক। বাংলায় ধর্মীয় মেরুকরণ করা সম্ভব একথা আমরা অনেকেই স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে দিব্যি সম্ভব কারণ আমাদের আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আমরা যাদের গোবলয় বলে হেয় করে এসেছি তাদের চেয়ে মোটেও বেশি নয়। আমরা ইউরোপ, লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের জন্যে গলা ফাটাতে পারি কিন্তু আজন্ম পরিচিত ফেজ পরা, দাড়িওয়ালা মুসলমান প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করতে পারি না।

ঘৃণার আবাদ করে দ্রুত সোনা ফলিয়ে ফেলল মৌলবাদীরা। বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন এল ২০১১ য় আর এই ২০১৮ তে দাঁড়িয়ে দেখছি যে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের কথা শোনাই যেত না সেখানে ধূলাগড় হল, চন্দননগর হল, খড়গপুর হল। এমনকি বাদুড়িয়া, আসানসোল হল যেখানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। অর্থাৎ সোশাল মিডিয়ায় যে ঘৃণার চাষ হচ্ছে তার ফসল ফলতে শুরু করেছে। যে বাংলায় ১৯৮৪ র শিখ গণহত্যার সময়ে শিখরা নিরাপদ ছিলেন, ১৯৯২ এ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কোন বড় সংঘর্ষ হয়নি, সেই বাংলার এত দ্রুত স্খলন চমকপ্রদ বইকি। যা গত কয়েকবছরে অনেক বিশ্লেষকই লিখেছেন তা হল এর পেছনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং হিন্দুত্ববাদী বিজেপির ক্ষমতার লড়াই আছে। তা আছে। কিন্তু যা তার চেয়েও বিপজ্জনক এবং আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে তা হল সংখ্যাগুরু বাঙালির মধ্যে ক্রমশ জমাট বাঁধতে থাকা বিশ্বাস যে সংখ্যালঘুরা তাদের শত্রু, আর সংখ্যালঘুদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। কেন এমন হল, কেন এমন হচ্ছে সেটা ভেবে দেখা ভীষণ জরুরী। কারণ শুরুতেই বলেছি, বাড়িটা দুলছে। সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাগুলো সেই দুলুনি।

পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের একটা  বড় অংশ দেশভাগের সময়ে বা তারও পরে পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা মানুষ। উদ্বাস্তু জীবন এমন একটা জিনিস যার যন্ত্রণা পারিবারিক স্মৃতিতে দগদগে ঘা হয়ে থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ফলত আজকে ত্রিসীমানায় মুসলমান নেই এমন এলাকায় বাস করা, কোন মুসলমানের দ্বারা কখনো বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পঁচিশ তিরিশ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও প্রবল মুসলমান বিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে। স্মৃতি প্রায়শই ইতিহাস মানে না, যুক্তি মানে না। আপনি যতই তাকে বোঝান যে তার দাদু-দিদিমার যে দুর্গতি হয়েছিল তা এপার থেকে ওপারে চলে যেতে হওয়া অনেক মুসলমান পরিবারেরও হয়েছে এবং এদেশের সাধারণ মুসলমানের তাতে কোনই হাত নেই — সে ওসব এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দেবে। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার ইতিহাস থাকলেও, ১৯৬৪ র পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে কোন সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ছিল না। এরকম শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গে জনমনে সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা অবলুপ্তির রাস্তায় হাঁটছিল। হিন্দুত্বের এড্রিনালিন ইঞ্জেকশন আবার তাকে জাগিয়ে তুলেছে। দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে। ফলে এখন পশ্চিমবঙ্গীয় (চলতি কথায় এদেশি) হিন্দু বাঙালিকেও বলতে শোনা যায় “জানিস ওরা কিরকম? অমুকদার ঠাকুমাকে এক কাপড়ে চলে আসতে হয়েছিল। এক মাস পায়ে হেঁটে শিয়ালদা স্টেশনে এসে প্ল্যাটফর্মে থাকতে হয়েছে এক বছর। ‘ওদের’ বেশি মাথায় তুলিস না। নইলে আমাদেরও ঐ অবস্থা হবে।” এক কথায় হিন্দিতে যাকে বলে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়।”

মনে রাখতে হবে, ১৯৬৪ থেকে ২০১১ র মধ্যে দুটো বিরাট ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে ভারত-পাক যুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম। এবং অব্যবহিত পরেই মুজিব হত্যা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ ইসলামিক মৌলবাদীদের হাতে চলে যাওয়া। এর ফলে স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্রোত কিন্তু বেড়ে গিয়েছিল। যা সামলাতে গিয়ে ১৯৭৮ এ মরিচঝাঁপির মত ঘটনা ঘটে। সে ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত, মৃত প্রত্যেকটি মানুষই কিন্তু হিন্দু। তৎসত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে “হিন্দু বিপদে আছে” এমন অভিযোগ ওঠেনি। তাহলে হঠাৎ আজ কী হল?

আসলে নিখাদ মিথ্যা তেমন শক্তিশালী  নয়। কিন্তু এক ভাগ সত্যির সাথে দু ভাগ মিথ্যে মিশিয়ে দিলে যে পানীয় তৈরি হয় তা মারাত্মক নেশা ধরায়।  এক ভাগ সত্যিটা কী? না বহু হিন্দুকে দেশভাগের সময়ে এবং পরবর্তীকালে ইসলামিক মৌলবাদীদের দাপটে পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ থেকে এ রাজ্যে চলে আসতে হয়েছিল। এর সাথে মেশানো হল দু ভাগ মিথ্যে — ১। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যাগুরু হয়ে যাবে (জনগণনা এবং অঙ্কশাস্ত্রকে মারো গুলি), ২। মুসলমানদের এ রাজ্যের সরকার বরাবর তোষণ করেছে (২০০৬ এর সাচার কমিটির রিপোর্ট বলছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা সাম্প্রদায়িকভাবে আক্রান্ত না হলেও আর্থসামাজিকভাবে হিন্দুদের থেকে কয়েক যোজন পিছিয়ে। কিন্তু ঐ যে, তথ্যের চেয়ে বিশ্বাস বড়)।

সেই ষাটের দশকের পর যে এ রাজ্যে আর সাম্প্রদায়িক হিংসা হয়নি তার জন্যে অবশ্যই কৃতিত্ব প্রাপ্য সরকারগুলোর। কিছুটা কৃতিত্ব নিশ্চয়ই প্রাপ্য বিরোধীদেরও। আজকের বিজেপির মত ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা তাঁরা করেননি। কিন্তু যে কোন দেশে বা রাজ্যেই সরকারের কার্যকলাপই রাজনীতির কম্পাস ঠিক করে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যে সত্য মিথ্যার ককটেল গেলাচ্ছে মানুষকে তাকে স্বাদু করার কাজটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারই করে যাচ্ছে। ভেবে দেখুন, কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের শাহি ইমামের নাম ২০১১ র আগে কতবার শুনেছেন আর পরিবর্তনের পর থেকে কতবার শুনলেন? আরো ভাবুন, সাচার কমিটির রিপোর্টে যে মুসলমানদের আর্থসামাজিক দুর্দশার কথা বলা হয়েছিল তার কতটা সুরাহা হল তৃণমূল সরকার ইমাম, মোয়াজ্জেমদের ভাতা চালু করায়? সরকারের এই দুটো সিদ্ধান্তেই যা অবশ্যই হয়েছে তা হল হিন্দুত্ববাদীদের সুবিধা। তাদের পক্ষে হিন্দুদের বিশ্বাস করানো সহজ হয়েছে এই কথা যে মমতা সরকার মুসলমানদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। গরীব, অল্প লেখাপড়া জানা মানুষ তো বটেই, শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তও তাই এখন ঝট করে বিশ্বাস করে ফেলছেন যে একদিনের উৎসব ঈদের জন্যে রাজ্য সরকার চার দিন ছুটি দিতে পারে। কৌম পরিচিতির রাজনীতি খুব সহজ পদ্ধতিতে কাজ করে। একবার যদি কাউকে বুঝিয়ে দিতে পারা যায় তার কৌম আক্রান্ত তখন উল্টোটা সে দেখেও দ্যাখে না। যে হিন্দু ভাবছে মমতা সরকার মুসলমানদের সরকার, সে যেমন ভুলে যায় কিরকম ঘটা করে কলকাতার রাজপথ বন্ধ করে দিয়ে দুর্গাপুজোর ভাসানকে কার্নিভালে পরিণত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আর সরকারী কর্মচারীদের ডি এ না দিলেও জামাইষষ্ঠী থেকে শুরু করে দুর্গাপুজো পর্যন্ত কত হিন্দু উৎসব উপলক্ষে কত ছুটি তিনি দেন। এই ভুলে থাকা আক্রান্ত হওয়ার অনুভূতিকে পুষ্ট করে। আর যে নিজেকে আক্রান্ত মনে করে সে যে কোন মুহূর্তে হিংসার আশ্রয় নিতে পারে।

হিন্দুরা ভাবছেন তাঁরা আক্রান্ত, ওদিকে বিনা দোষে অভিযুক্ত হতে হতে মুসলমানরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন। মুর্শিদাবাদ জেলা, যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয় পেতে দীর্ঘ আন্দোলন করতে হয় অথচ ইমাম, মোয়াজ্জেমদের জন্য সরকার ভাতা চালু করায় (তাও আবার ওয়াকফ তহবিলের টাকায়, যা কোনভাবেই অমুসলমান করদাতার টাকা নয়) দিনরাত সাধারণ মুসলমানকে শুনতে হয় তাঁরা অন্যায় সুবিধা ভোগ করেন। এক মসজিদের ইমাম যা মুখে আসে তাই বলছিলেন বলে তাঁর সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্কহীন মুসলমান নাগরিককে তার জন্যে কটূক্তি শুনতে হয়। বাংলাদেশে মৌলবাদীরা অভিজিৎ রায়, শাজাহান বাচ্চুর মত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলে পশ্চিমবাংলার মুসলমানকে শুনতে হয় “কদিন পরে এখানেও এরকমই করবে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে চলে যাবে।” ১৯৭১ এর বহু পরে, এই সেদিনও বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে বহু হিন্দু চলে এসেছেন, স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন পশ্চিমবাংলার অথচ অরক্ষিত বা কুরক্ষিত সীমান্তের কারণে পশ্চিমবঙ্গের তিন চার পুরুষের বাসিন্দা মুসলমানেরও কানে আসে “এরা সব বাংলাদেশী।”

দুর্গতির এখানেই শেষ নয়। এই নিরাপত্তার অভাববোধকে গত কয়েকবছর ধরে উসকে দিতে দিতে ইদানীং আবার শাসকদলের মনে হয়েছে অঙ্কটা বুঝি ভুল হয়ে যাচ্ছে। মানে হিসাবটা ছিল — বিজেপি বাড়ুক, তাতে সংখ্যালঘু আরো ভয় পাক। যেহেতু বিজেপিবিরোধী শক্তি মানে শুধু  আমি কারণ বাম, কংগ্রেস লুপ্তপ্রায় তাই ওরা আমায় ঢেলে ভোট দেবে আর আমি জিতব। এখন মনে হচ্ছে বিজেপি বুঝি একটু বেশিই বেড়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ  সংখ্যালঘু ভোটের সাথে যেটুকু সংখ্যাগুরু ভোট পেলে জয় নিশ্চিত হয় সেটুকুও পিছলে যাচ্ছে। তা তো হতে দেওয়া যায় না। অতএব রামনবমীর মিছিল নিয়ে প্রতিযোগিতা, অতএব ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা। মানে এ রাজ্যের সংখ্যালঘুরা স্বঘোষিত হিন্দুত্ববাদী দলটার কাছে খলনায়ক তো বটেই, স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদলের কাছেও পরিহার্য ভোটব্যাঙ্কমাত্র। এই বিচ্ছিন্নতাও ভয় দেখায়। ভীত মানুষ বিপজ্জনক হয়ে উঠতেই পারে। পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় তো আর আসানসোলের ইমাম সিবতুল্লা রশিদি নেই। আর হিন্দুত্ববাদ তো খুঁজে বেড়াচ্ছেই এমন জমি যেখানে তাঁর মত কেউ নেই। সংখ্যালঘুর ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যুক্তি ঝুলি থেকে বার করার সুযোগ পাওয়া যাবে যে।

ভূমিকম্পের সময় বাহির হয়ে বাইরেই দাঁড়াতে হয়। আমাদের সাধের বাংলা দুলছে। এই বেলা যদি আপন হতে বাহির না হতে পারেন, যদি বুকের মাঝে আপনার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সহনাগরিকের সাড়া না পান, তাহলে বাংলা ধূলিসাৎ হবে। ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করতে হবে “মানুষ মেরেছি আমি — তার রক্তে আমার শরীর /
ভ’রে গেছে; / পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার ভাই আমি; / আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু / হৃদয়ে কঠিন হ’য়ে বধ ক’রে গেল…”

 

অর্কদ্যুতি চারদিকের মিশকালো অন্ধকারে আলো খুঁজে চলা একজন সাধারণ বাঙালিসপ্তাহে ছদিন ছাপার অক্ষরের সাথে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কাটানোই তার পেশা প্রাণে যা চায় লিখতে পারা আর পড়তে পারার বেশি অর্কদ্যুতির কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই