May a good source be with you.

চিরকেলে বাণী: নৈরাজ্যের রাজ্যে অব্যর্থ অজুহাত শাসক বুদ্ধিজীবীর

আজকের পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে এত দার্শনিক হলে আপনার সমূহ বিপদ।

সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা শব্দ সম্ভবত ‘চিরকাল’।

কেউ হয়ত বললেন “আজকাল আর মেয়েদের কোন নিরাপত্তা নেই। কিভাবে ধর্ষণ বেড়ে গেছে!”

অবধারিত উত্তর আসবে “চিরকাল হয়েছে। আগে তো এত মিডিয়া ছিল না, তাই জানা যেত না।”

হয়ত কেউ কাগজে লিখলেন “নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে এত রক্তপাত কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।”

মন্তব্য আসবে “চিরকাল হয়েছে। আগে তো এত মিডিয়া ছিল না, তাই জানা যেত না।”

ট্রেনে বাসে আলাপচারিতায় বলে দেখুন “কি দিনকাল পড়ল! ছেলেমেয়েরা নম্বর পেয়েও মোটা টাকা ঘুষ না দিলে কলেজে ভর্তি হতে পারছে না।”

ঠিক কেউ না কেউ বলে উঠবে “চিরকাল হয়েছে। আগে তো এত মিডিয়া ছিল না, তাই জানা যেত না।”

এই চিরকেলে বাণী এক অর্থে নির্ভুল। কারণ দুনিয়ায় এমন দুষ্কর্ম কমই আছে যা আমরা এইমাত্র শুরু করলাম। খুন, জখম, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ কিংবা ঘুষ নেওয়া — কোনটাই মানবেতিহাসে অশ্রুতপূর্ব ঘটনা নয়। মুশকিল হল এরকম দার্শনিক উদাসীনতা হিমালয়ের সুউচ্চ শিখরে কোন পাণ্ডববর্জিত স্থানে পদ্মাসনে বসে সাধনার পক্ষে দারুণ মানানসই। আজকের পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে এত দার্শনিক হলে আপনার সমূহ বিপদ। আপনি মনে করতেই পারেন, মনোনয়ন দিতে গিয়ে মার খেয়েছে, মরেছে তো কিছু বিরোধী দলের লোক, শাড়িও খোলা হয়েছে সিপিএমের মহিলাদের, অর্ধোলঙ্গ করে ওঠবোস করানো হয়েছে কোন এক অনামী সাংবাদিককে। সেই ২০১১ থেকে ধর্ষণ যাদের হয়েছে আর ঘটনা সাজানোর বদনাম যারা পেয়েছে তারাও আমার কেউ হয় না। তাহলে আগে কখনো সত্যিই এমনটা হয়েছিল কিনা, মহিলাদের লাঞ্ছনার ঘটনাও আগের চেয়ে সত্যি বেড়ে গেছে কিনা, তা দিয়ে আমার কী দরকার? তর্কবিতর্কে আমার একটা মতামত দেওয়া প্রয়োজন, অতএব দিলাম। সত্যিই তো। তথ্যগতভাবে সর্বৈব মিথ্যা বললেন কিনা সে খোঁজ আপনি কেনই বা রাখতে যাবেন, যখন যা বলেছেন তা সত্য হলেও আপনার লাভ নেই, মিথ্যা হলেও আপনার ক্ষতি নেই? আপনার সমর্থনে এটুকুই বলার আছে যে আপনি অলস কথোপকথনে যা বলেন, অনেক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যত্নলালিত দাড়ি চুলকে খবরের কাগজের সম্পাদকীয় স্তম্ভে তা লেখেন, খবরের চ্যানেলের সান্ধ্য কাজিয়ায় বলেনও। তথ্য চুলোয় যাক।

এতে দুরকম ক্ষতি হয়। স্বল্পমেয়াদী ক্ষতি এই যে যারা অত্যাচারিত তাদের অত্যাচারকে লঘু করে দেখিয়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দেওয়া হয়, শাসকের ব্যর্থতা এবং বদমাইশির উপরে প্রলেপ দিয়ে তার আরও বেপরোয়া হওয়া নিশ্চিত করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এই যে নিজের পাশটা আপনি নিজেই খালি করেন। জেনে রাখুন, প্রশ্রয় পেয়ে মাথায় ওঠা ধর্ষকদের হাত অনতিবিলম্বে আপনার আত্মীয়াদেরও আঁচড়াতে কামড়াতে চাইবে, আপনার সন্তানও পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে পারবে না ঘুষ দিতে পারার অক্ষমতায়। আমার, আপনারই ঘরের কোন শিক্ষিত বেকার আবিষ্কার করবে একগাদা ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও তার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন কোনদিন পূরণ হবে না কারণ এস এস সি পরীক্ষাটাই হবে না। হলেও শাসক দলের সাথে চেনা জানা না থাকায়, কাকে ঘুষ দিতে হবে জানা নেই বলে সে চাকরি পাবে না। হতাশায় আরো অনেকের মত সে-ও হয়ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে।

তত্ত্ব হল, এবার একটু তথ্যে আসা যাক।

পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আলোচনায় তৃণমূল সরকারের সাত বছরকে নিষ্কলঙ্ক প্রমাণ করতে যে “চিরকাল” টেনে আনা হয়, তা ব্যতিক্রমহীনভাবে বামফ্রন্টের ৩৪ বছর। তত্ত্বটা মমতাময়ী মুখ্যমন্ত্রী নিজেই চালু করেছিলেন ক্ষমতায় আসার পরে পরেই, ভক্তবৃন্দ এবং পেটোয়া সংবাদমাধ্যম শুধু শিরোধার্য করেননি, খাইয়েদাইয়ে স্বাস্থ্যবান করে তুলেছেন। তা সেই চিরকালে “এত মিডিয়া ছিল না” — এমন সত্যের অপলাপ আর হয় না। ইংরিজিতে যাকে “24-hour news channel” বলে, পশ্চিমবঙ্গে তা চালু হয় ২০০৫-০৬ এ। ঐ দুবছরে পরপর স্টার আনন্দ (অধুনা এবিপি আনন্দ), কলকাতা টিভি, ২৪ ঘন্টা হৈ হৈ করে বাজারে এসে যায়। পিছু পিছু আরো অনেকে। বাম শাসন চলেছিল ২০১১ পর্যন্ত। রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার দিক থেকে, ক্ষমতায় টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টার দিক থেকে এই শেষ ছ বছরই বামফ্রন্টের সবচেয়ে কলঙ্কিত সময়। অর্থাৎ মোক্ষম সময়ে সদাজাগ্রত সংবাদমাধ্যম সরকারী দলের কুকর্ম আমাদের সামনে তুলে ধরার সময় পেয়েছিল, ধরেছিলও। নইলে পরিবর্তন সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাধ্য। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পর্বে এখনকার ধুঁকতে থাকা দৈনিক স্টেটসম্যানের বিপুল জনপ্রিয়তা এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য।

যে নামগুলো উল্লেখ করলাম তাদের সাথে যোগ করুন ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা সকালবেলা, বেঙ্গল পোস্ট, চ্যানেল টেনের মত একগুচ্ছ কাগজ ও চ্যানেল যাদের আজ আর অস্তিত্ব নেই কারণ সুদীপ্ত সেনরা (সেই গৌরী সেনেরই সগোত্র নিঃসন্দেহে, যিনি ‘লাগে টাকা দেবে…’ প্রবাদে অমর হয়ে আছেন) গারদে। এগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্যই ছিল মমতাদেবীর ক্ষমতায় আরোহণ ত্বরান্বিত করা।

অধুনা ওয়েব মিডিয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার উপস্থিতি অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদজগতে এখনো কম, তখন প্রায় ছিলই না। ফলে সেদিক থেকে কোন বাড়তি সুবিধা আগের সরকার পায়নি।

সিপিএমের দলীয় মুখপত্র ‘গণশক্তি’ আর পরিবর্তনের পরে সুর বদলে ফেলা ‘আজকাল’ ছাড়া আর কোন সংবাদপত্র বামফ্রন্ট সরকারের গুণমুগ্ধ ছিল এমন অভিযোগ কাগজগুলোর পরম শত্রুও করবে না। চ্যানেলগুলোর মধ্যেও একমাত্র ২৪ ঘন্টাই সে যুগে বামেদের প্রতি নরম মনোভাবাপন্ন ছিল বলে অভিযোগ।

হায় রে! এতৎসত্ত্বেও বাম আমলে মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে কারো অঙ্গহানি, প্রাণহানি, সম্মানহানির খবর বা ছবি সেই ক্রান্তিকালে পাওয়া যায়নি! এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় কিনা সেই সময়ের পরিবর্তনপন্থী বিদ্দ্বজ্জনদের অনেককেও সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে হল “এমন দৃশ্য আগে দেখিনি।” তবু, মাননীয় নিরপেক্ষ নাগরিকরা বলেই যাবেন “চিরকাল হয়েছে।”

এই নিরপেক্ষদের লড়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে অবশ্য কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই। কারণ তথ্য তত্ত্বকে একেবারেই সমর্থন করছে না দেখলে এঁরা নতুন তত্ত্ব হাজির করতে সিদ্ধহস্ত। যদিও এই নতুনত্ব আসলে রিমেকত্ব। যেমন মনোনয়নে হিংসা নিয়ে প্যাঁচে পড়ে যাওয়ায় মমতাদেবীর বহু পুরনো “সাইন্টিফিক রিগিং” তত্ত্বের রিমেক ওঁরা বাজারে এনেছিলেন। নাম ছিল “নীরব সন্ত্রাস”। অর্থাৎ বামেরা এমন চুপিচুপি ভয় দেখাত বিরোধীদের যে তারা মনোনয়ন জমা দিতেই যেত না, ফলে এহেন সন্ত্রাস চোখে পড়ত না। কিন্তু ব্যাপারটা একই ছিল।

তত্ত্বটার ভাত মেরে দিল ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ কাগজ। ৩০ শে এপ্রিলের কাগজে তারা রীতিমত লেখচিত্র প্রকাশ করে দেখাল যে বাম আমলে সবচেয়ে বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসক দল জিতেছিল ২০০৩ এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে — এগারো শতাংশ। দিদি আর তাঁর ভাইয়েরা এ বছর বিরাট কোহলির মত সব রেকর্ড চুরমার করে ৩৪.২% আসন দখল করে ফেলেছেন নির্বাচনের আগেই। বরাবরের বামবিরোধী কাগজটি একথাও না লিখে পারল না যে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বাম আমলে নেহাত অপেশাদাররা ভোট করার দায়িত্বে ছিল।

কিন্তু এসব তথ্যের কচকচিতে হবে কী? মাননীয় নিরপেক্ষ নাগরিকের মত পরিবর্তন করে কার সাধ্যি? পশ্চিমবঙ্গের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং মনোমত বিষয়ে অনার্স পাওয়ার জন্যে বোর্ডের পরীক্ষায় যথেষ্ট নম্বর পাওয়ার আর কোন প্রয়োজন নেই আজ। প্রয়োজন অভিভাবকের মোটা টাকা ঘুষ দেওয়ার ক্ষমতা। চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন কলেজের অনার্স পাঠক্রমের আসনের মূল্য বেঁধে দিচ্ছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, না পারলে তুমি ফেল। সে পঞ্চাশ শতাংশ পেয়েই পাশ কর আর পঁচানব্বই শতাংশ পেয়েই পাশ কর। এই নিয়ে সেদিন সরকারের মুণ্ডপাত করছিলেন এক সহকর্মী, আরেকজন, যার জন্ম অবধারিতভাবে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পরে, বৃদ্ধ প্রপিতামহের মত বলে উঠলেন “চিরকাল হয়েছে। আগে তো এত মিডিয়া ছিল না, তাই জানা যেত না।“ অগ্রজ সহকর্মীরা, যাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন পশ্চিমবঙ্গের সর্বনাশ করেছে সিপিএম, তাঁরাও কেমন থমকে গেলেন। অতঃপর বাকবিতণ্ডা।

জিজ্ঞেস করা হল, ছেলেটি কোন কলেজে কার প্রতি এমন অবিচার ঘটতে দেখেছে। সে বুক ফুলিয়ে একটিই দৃষ্টান্ত হাজির করল — খোদ তার কাছেই ছাত্র সংসদ ঘুষ চেয়েছিল। সে বীরপুরুষ, একটি পয়সাও দেয়নি। এক সহকর্মী প্রত্যুত্তর দিলেন “না দিয়েও ভর্তি হতে পেরেছ তো? এবারে কিন্তু পারা যাচ্ছে না।” আরেকজন বেশ রেগে বললেন “বললেই হল পশ্চিমবঙ্গে চিরকাল এরকম হত? আমরা লেখাপড়া করিনি এখানে?”

এই প্রশ্নেই ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়ল বেড়াল। বীরপুরুষ বললেন “আপনাদের সময়ের কথা জানি না। আমি তো এই সরকারের আমলে কলেজে ভর্তি হয়েছি।“ আঁধারে আলো এই, যে উঠতে বসতে বিমান বসুকে গাল পাড়া অগ্রজরা তাকে বোঝালেন চিরকালটা ২০১১র মে মাসে শুরু হয়নি। তার আগেও এই রাজ্যটা ছিল, স্কুল কলেজ, লেখাপড়া ছিল। কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী ছিল না বটে তবে অবস্থা এত হতশ্রী ছিল না যে সসম্মানে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের টাকা দিয়ে প্রাপ্য স্থান কিনতে হবে।

তবে এ হল ইংরিজিতে যাকে বলে anecdotal evidence. প্রমাণ হিসাবে ঐ অগ্রজদের অভিজ্ঞতার বিশেষ মূল্য নেই, যদি না স্যাম্পেল সাইজ যথেষ্ট বড় হয়। ঠিক যেমন এই লেখকের স্মৃতিরও মূল্য নেই, যে স্মৃতি বলছে উচ্চমাধ্যমিকের পর এ কলেজ সে কলেজে ভর্তির জন্যে ঘুরতে গিয়ে দেখা গেছিল বহু কলেজেই ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা বসে আছে যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের থেকে দু টাকা করে চাঁদা নেবে বলে। কোথাও তারা এস এফ আই, কোথাও ছাত্র পরিষদ। টাকার অঙ্কটাও কোথাও দু টাকা, কোথাও পাঁচ, কোথাও দশ, দু একটি ক্ষেত্রে পঞ্চাশ। এবং সে টাকাও ভর্তি হলে দেয়, ভর্তি হওয়ার শর্ত নয়। দু টাকার কুপন নিয়ে এস এফ আই সদস্য হতেই হবে এমন জুলুমও কোথাও কোথাও ছিল কিন্তু এস এফ আই কে পঞ্চাশ, ষাট হাজার টাকা ঘুষ না দিলে আদৌ ভর্তি হওয়া যাবে না — এমনটা কোথাও দেখা যায়নি।

অনেক খুঁজে যখন কোন সংবাদমাধ্যমেও “চিরকাল” আজকের মত তোলাবাজি হয়েছে বলে কোন প্রতিবেদন পেলাম না, তখন সোশাল মিডিয়ায় খুঁজতে শুরু করলাম। খুঁজতে খুঁজতে দেখি Arkady Gaider বলে একজন, ফেসবুকে যাঁর ফলোয়ার সংখ্যা নশোর বেশি, তিনি নিজের প্রোফাইলে একটা প্রশ্নমালা রেখেছেন সকলের জন্যে। সেটা এরকমঃ

১) কোন কলেজ?

২) কোন জেলা?

৩) ইউনিয়ন কাদের ছিল?

৪) অ্যাডমিশন করাতে কোনরকম টাকা বা ‘অনুদান’ চাওয়া হয়েছিল কিনা? হলে কত?

৫) আপনি কি সেই টাকা দিয়েছিলেন?

৬) না দিলে কি কোনরকম হেনস্থা করা হয়েছিল?

সদ্য লেখাপড়া শেষ করা ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে এমন মানুষও উত্তর দিয়েছেন যিনি কলেজজীবন শেষ করেছেন জ্যোতি বসু সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়ারও আগে। শেষ যখন দেখলাম ততক্ষণে সাড়ে তিনশোর বেশি উত্তর এসে গেছে, একজনও লেখেননি এরকম সিট কেনাবেচার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যাঁদের কলেজে এস এফ আই এর ইউনিয়ন ছিল, তাঁরাও নন, যাঁদের কলেজে ছাত্র পরিষদ বা টি এম সি পি ছিল তাঁরাও নন। একজন অবশ্য ২০১৬ র একটি অভিজ্ঞতা লিখেছেন, কিন্তু সেখানেও টাকা না দেওয়ায় ভর্তি আটকায়নি।

এমন দাবী করার মানে হয় না যে বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ইদানীং বাম নেতারাও তেমন বলেন না, কারণ সকলেই বোঝেন তা যদি হত তাহলে ২০০৯ এর পর ভোটবাক্স থেকে বামেদের ভোট এমন কর্পূরের মত উবে যেত না। শিক্ষাক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়ার আনন্দবাজারী নামকরণ হয়েছে ‘অনিলায়ন’, সেই প্রক্রিয়ায় পার্টিঘনিষ্ঠদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, এমনকি উপাচার্য পদে নিয়োগও হয়েছে নিঃসন্দেহে। তা বলে যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের তোলাবাজির মুখাপেক্ষী করে তোলার এই নির্লজ্জা, শিক্ষাব্যবস্থাকে বিহারের মত বিশ্বাসযোগ্যতাহীন করে ফেলার সরকারী দুঃসাহসকেও অনিলায়নের সাথে তুলনা করে “চিরকাল হয়েছে” বলার নিরপেক্ষ বদমাইশি ক্ষমার অযোগ্য। টি এম সি পি র রাজ্য সভাপতির লোক দেখানো অপসারণ এবং মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের কলেজ চত্বরগুলোতে ঝটিকা সফর সত্ত্বেও তোলাবাজি কিন্তু চলছেই। এ জিনিস “চিরকাল হয়েছে” বলার মিথ্যাচারকে নিরপেক্ষতা দিয়ে ঢাকা যায় কি?

তাছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে গুন্ডামি তো এখানেই শেষ নয়। অনিলায়নের যুগেও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার কখনো চোখ রাঙিয়ে বলতে যায়নি কলেজ কিভাবে চালাতে হবে, ভর্তির প্রক্রিয়া কী হবে। যাঁদের “দলদাস” বলা চালু, যাঁদের অনেকে আবার শিক্ষাজগতের প্রতি পরম মমতায় রঙ বদলে পদ বজায় রেখেছেন, তাঁদেরকেও ওভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং সর্বোচ্চ নেতৃত্বে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও বামফ্রন্ট সরকার প্রেসিডেন্সি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করে দিয়েছিলেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বাড়তে দেওয়া হয়েছিল নিজের নিয়মে। বামেরা মেধার অবমূল্যায়ন করে এবং মধ্যমেধাকে প্রশ্রয় দেয় যাঁরা বলতেন, তাঁদের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা পরিবর্তনের সরকার প্রেসিডেন্সির এমন হাল করেছে যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ক্লাসঘর, ক্যান্টিন হয়েছে কিন্তু মেধাবী অধ্যাপকরা পালিয়ে বাঁচছেন। এমনকি এখন অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন “এর চেয়ে কলেজ থাকলেই ভাল ছিল।”

আর যাদবপুর? গোড়া থেকেই দিদি বুঝেছেন ওখানকার ভাইবোনেরা বড্ড দুর্বিনীত। আর তাদের “বহিরাগত” সমর্থনও প্রচুর। তাই পেটোয়া উপাচার্য ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢোকালে কলকাতার রাজপথ মিছিলে অবরুদ্ধ হয়, শেষে সেই উপাচার্যকে সরাতে হয়। ওদিকে গায়ের জোরে রাজ্যের সব কলেজ দখল করে ফেললেও এখানে পা রাখতে পারে না তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। অতএব এই লক্ষ্মীছাড়ার দলকে লাগাম পরানো দরকার। তাই শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য “নিরানব্বইটা কলেজ ভাল। খারাপ শুধু এই যাদবপুর।” সে ন্যাক (NAAC) যা-ই বলুক। সুতরাং যাদবপুরে প্রবেশিকা পরীক্ষা হবে কি হবে না তা ঠিক করবে সরকার। পরীক্ষা হলেও তার প্রশ্ন তৈরি, খাতা দেখার অধিকার থাকবে না যাদবপুরের মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের। শেষে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার বাঁচাতে অনশনে বসতে হবে ছাত্রছাত্রীদের।

আসলে সরকার বোঝে যে “এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।” তাই পড়াশোনা ব্যাপারটাই তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা কর। এস এস সি পরীক্ষাকে অন্তর্জলী যাত্রায় পাঠিয়ে, স্কুল শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট, ডি এ র চেয়ে ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়া বেশি জরুরী করে তুলে, সহকর্মীর রহস্যমৃত্যুর বিচারের দাবীতে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের জেলে পুরে এমনিতেই মেধাবী ছেলেমেয়েদের বার্তা দেওয়া হচ্ছে “আর যা-ই কর বাপু, মাস্টারি কোর না।” এবার একেবারে কলেজের লেখাপড়াটাও তুলে দেওয়া আর কি।

নিরপেক্ষ নাগরিকরা, এসব দেখে, “চিরকাল হয়েছে” ঘোষণা করে “দু কানে চশমা আঁটিয়া ঘুমাইনু রাতে, দিব্যি হতেছে নিদ বেশি।“ আসলে নিরপেক্ষ হওয়া তো তাঁদের পক্ষেই সম্ভব যাঁরা ছেলেমেয়েকে ভিনরাজ্যে বা ভিনদেশে পড়তে পাঠানোর সঙ্গতি রাখেন। চিরকেলে বাণী তো তাঁরাই দিচ্ছেন এখনো যাঁরা ভুলতে পারেননি মাটিতে চরণ না ফেলেও মাটির মালিক থাকা বন্ধ করে দিয়েছিল অপারেশন বর্গা। আজও উবের, ওলায় বসে বাষ্পাকুল নয়নে কতজনকে যে বিলাপ করতে শোনা যায় অমুক গ্রামে তাঁর পারিবারিক সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার জন্যে বামফ্রন্ট এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ দেয়নি। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ র মধ্যে পঞ্চায়েত অথবা মিউনিসিপ্যালিটি হয়ে ওঠা গ্রামে, মফঃস্বলে কত মানুষকে যে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে বাড়ির কাজের লোকের জনপ্রতিনিধি হয়ে যাওয়া। সেসবের তুলনায় এখন যা হচ্ছে এ আর এমন কী? এমন তো চিরকাল হয়েছে।

 

Support NewsCentral24x7 and help it hold the people in power accountable.
अब आप न्यूज़ सेंट्रल 24x7 को हिंदी में पढ़ सकते हैं।यहाँ क्लिक करें
+